একটি ক্ষুদ্র সংঘর্ষ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, কিংবা মাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র—আর এই সরু পথই বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বিশ্বশক্তির ভারসাম্য। আজকের এই ব্লগে আমরা দেখব, হরমুজ প্রণালি কি সত্যিই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্রিগার হতে পারে? আর যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির মানচিত্র ঠিক কেমন হবে?
বিশ্বের
‘এনার্জি হার্টবিট’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, এক টুকরো জলপথ নিয়ে সারা বিশ্বের এত মাথা ব্যথা কেন? উত্তরটা খুব সহজ শক্তি বা এনার্জি।
প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ব বাজারে
রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান প্রধান অর্থনীতি, যেমন—সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত
এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি এই রাস্তার ওপর নির্ভরশীল।
যদি
কোনো কারণে এই প্রণালিতে মাত্র ৭ দিনের জন্য শিপমেন্ট বন্ধ হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের
দাম ১০০ ডলার থেকে লাফ দিয়ে ২০০-২৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি একটি বৈশ্বিক মন্দা
(Global Recession) ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট। এই কারণেই বড় সামরিক জোটগুলো সবসময় হরমুজ
নিয়ে তটস্থ থাকে। সহজ কথায়, হরমুজ হলো বিশ্বের “এনার্জি হার্টবিট”। এই হার্টবিট
বন্ধ হলে পুরো বিশ্ব অসুস্থ হয়ে পড়বে।
নিয়ন্ত্রণের
দ্বৈরথ: ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজের
ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে। প্রণালির উত্তর অংশটি সম্পূর্ণ
ইরানের সীমানায়। ইরান খুব ভালো করেই জানে যে, এটি তাদের হাতে থাকা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
অর্থনৈতিক অস্ত্র। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড (IRGC) এখানে হাজার হাজার মাইন, অ্যান্টি-শিপ
মিসাইল এবং ড্রোন প্রস্তুত রেখেছে। ইরানের কৌশলটি পরিষ্কার: “যদি আমাকে আক্রমণ করা
হয়, তবে আমি পৃথিবীর দরজা বন্ধ করে দেব।”
অন্যদিকে,
এই "দরজার" পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর
৫ম বহর (Fifth Fleet)। তাদের মূল কাজ হলো তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
এবং ইরানকে সামরিকভাবে ব্যালেন্স করা। এই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণই ঝুঁকিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে
নিয়ে আসে। একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়া বা একটি ট্যাংকার আটক করার মতো সামান্য ঘটনাও যেকোনো
সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ইতিহাসের
দগদগে ক্ষত
হরমুজে শান্তি যে কতটা ভঙ্গুর, তা ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে।
আশির দশকে ইরান-ইরাক
যুদ্ধের সময় শুরু হয়েছিল ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’, যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরের তেলের জাহাজে
হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় মার্কিন নৌবাহিনীকে সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়।
২০১৯
সালের কথা ভাবুন, যখন ওমান উপসাগরে ৬টি বড় ট্যাংকারে রহস্যজনক বিস্ফোরণ ঘটে এবং ইরান
একটি শক্তিশালী মার্কিন গ্লোবাল হক ড্রোন গুলি করে নামায়। সেই সময় বিশ্ব একটি বড় যুদ্ধের
একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে পাওয়া শিক্ষাটি হলো—হরমুজে একবার আগুন
লেগে গেলে সেটি আর “আঞ্চলিক সমস্যা” থাকে না, বরং তা বিশ্বব্যাপী দাবানল ছড়িয়ে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের
বদলে যাওয়া শক্তির অক্ষ
২০২৬
সালের মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মতো নেই। এখানে এখন ক্ষমতার নতুন অক্ষ তৈরি হয়েছে। যেখানে
আগে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন চীন হয়ে উঠেছে বড় এক মধ্যস্থতাকারী।
চীন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা। সৌদি-ইরান সম্পর্কের বরফ গলানোর
পেছনে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
বর্তমান
মধ্যপ্রাচ্যে আমরা তিনটি প্রধান বলয় দেখতে পাচ্ছি:
- চীন
– সৌদি আরব – ইরান:
যারা স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যের ওপর জোর দিচ্ছে।
- যুক্তরাষ্ট্র
– ইসরায়েল – ইউরোপ:
যারা কৌশলগত নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।
- তুরস্ক
– কাতার – রাশিয়া:
যারা নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থে প্রভাব বিস্তার করতে সচেষ্ট।
এই
নতুন মানচিত্রটি হরমুজকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ
করে ইসরায়েল যখন ইরানকে একটি কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখছে, তখন সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ
বেড়ে যায়।
যুদ্ধের
সম্ভাব্য ৫টি দৃশ্যপট
বিশ্লেষকরা
হরমুজকে কেন্দ্র করে ৫টি বাস্তবসম্মত ঝুঁকির কথা বলেন যা বিশ্বযুদ্ধের ট্রিগার হতে
পারে:
- ট্যাংকারে
বড় হামলা: ড্রোন
বা মিসাইলের আঘাতে তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস হওয়া এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া।
- ইরান
কর্তৃক প্রণালি বন্ধ:
যদি ইরান সত্যিই ‘চোকপয়েন্ট’ ব্লক করে দেয়, তবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি থমকে যাবে।
- ইসরায়েলের
আক্রমণ: ইরানের
পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের কোনো হামলা ইরানকে সরাসরি হরমুজ বন্ধে বাধ্য করতে
পারে।
- সুপারপাওয়ারের
লড়াই: আমেরিকার
সামরিক উপস্থিতির জবাবে চীনের সরাসরি বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ।
- ভুল
হিসাব বা মিসক্যালকুলেশন:
একটি ছোট ভুল সংকেত বা ভুল ব্যাখ্যা থেকে শুরু হওয়া প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধ।
বাস্তব
সত্য: বিশ্বযুদ্ধ কি হবে?
কঠোর
বাস্তবতা হলো—হরমুজে সংঘাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ হওয়াটা কিছুটা
কঠিন। কারণ বড় শক্তিগুলো জানে, এই পথ বন্ধ হওয়া মানে তাদের নিজেদের অর্থনীতিও ধ্বংস
হওয়া। চীন তেল না পেলে তাদের কারখানা বন্ধ হবে, আমেরিকা তেলের দামের চাপে মুদ্রাস্ফীতির
মুখে পড়বে।
তাই
উত্তেজনার পারদ চড়লেও, সব পক্ষই একটি ‘সীমিত সামরিক সংঘাত’ বা ছায়া যুদ্ধের
(Shadow War) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইবে। তবে ইতিহাসের পাতায় বড় বড় যুদ্ধগুলো সবসময়
হিসেব করেই শুরু হয়নি, অনেক সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ভুল থেকে শুরু হয়েছে।
হরমুজ
প্রণালি পৃথিবীর ভবিষ্যতের একটি চাবিকাঠি। এখানে তেল আছে, রাজনীতি আছে এবং আছে ক্ষমতার
নিষ্ঠুর খেলা। এই সরু পথটিই নির্ধারণ করবে আমরা শান্তির পথে হাঁটব নাকি ধ্বংসের দিকে।
আপনার মতামত জানান: আপনার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে কোন দৃশ্যপটটি ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি? এটি কি কেবল তেলের লড়াই নাকি শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই? আপনার ভাবনা কমেন্টে শেয়ার করুন।



.png)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন