আজকের দুনিয়ায় 'ইরান' শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিক্ষোভ, জ্বলন্ত রাস্তা আর উত্তাল কিছু স্লোগান। গত কয়েক বছর ধরে ইরানের শহরগুলোতে যা ঘটছে, তা দেখে পৃথিবীর বড় বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকও আজ থমকে দাঁড়িয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা মত—কেউ বলছেন আমেরিকার সিআইএ কলকাঠি নাড়ছে, কেউ বলছেন ইসরায়েল চাইছে ইরানকে লিবিয়া বা ইরাকের মতো ধ্বংস করে দিতে। আবার কারো মতে, এবার বুঝি আয়াতুল্লাহদের শাসনের অবসান হতে চলেছে।
কিন্তু ইরান কোনো সাধারণ মানচিত্রের নাম নয়, এটি একটি হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা। এই জাতি গ্রীক, মঙ্গোল, আরব থেকে শুরু করে আধুনিক ব্রিটিশ-আমেরিকান দাপট—সবই দেখেছে। ইতিহাস বলে, ইরানিরা বাইরের চাপে যতটা না ভাঙে, তার চেয়ে বেশি বদলায় ভেতর থেকে। আজকের ব্লগে আমরা খুব ঠান্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করব—ইরান কি আসলেই পতনের দিকে যাচ্ছে?
১. শাহ শাসনের স্বর্ণযুগ না কি দম্ভের পতন?
অনেকেই মনে করেন ১৯৭৯ সালে শাহের পতন হঠাৎ ঘটেছিল। কিন্তু এর বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক আগে। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন একজন আধুনিক মনস্ক মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন ইরানকে রাতারাতি প্যারিস বা লন্ডনের মতো বানিয়ে ফেলতে। তিনি নারীদের ভোটাধিকার দিলেন, বড় বড় কারখানা বানালেন। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়:
শহর বনাম গ্রাম: শাহের উন্নয়ন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের রক্ষণশীল মানুষ এই পশ্চিমা সংস্কৃতি গ্রহণ করতে পারছিল না।
সাভাক (SAVAK) ও দমন-পীড়ন: শাহের গোপন পুলিশ বাহিনী 'সাভাক' বিরোধীদের ওপর এতটাই নির্মম ছিল যে, মানুষের মনে ভালোবাসার বদলে ঘৃণা জমে গিয়েছিল।
বিদেশের পুতুল ভাবমূর্তি: ১৯৫৩ সালে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সরিয়ে আমেরিকা যখন শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তখন থেকেই ইরানিদের মনে দাগ পড়ে যায় যে—শাহ তাদের নিজের লোক নন, তিনি আমেরিকার পুতুল।
ইতিহাসের শিক্ষা: যখন একটি জাতি সম্মান হারানোর কষ্টে ভোগে, তখন তারা মৃত্যুকেও ভয় পায় না। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই খোমেনির ডাক মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছিল।
২. ইসলামিক বিপ্লব ও ক্ষমতার অনন্য কাঠামো
১৯৭৯ সালে শাহের পতন হলে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। তিনি প্রবর্তন করেন 'ভেলায়াত-ই ফকিহ' নামক এক শাসনব্যবস্থা। এর বৈশিষ্ট্য হলো:
সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader): প্রেসিডেন্ট বা সংসদ যাই থাকুক না কেন, শেষ কথা বলবেন একজন সর্বোচ্চ ধর্মতাত্ত্বিক নেতা।
প্রতিরক্ষা কবজ: শুধু সেনাবাহিনী নয়, এখানে আছে 'রেভোলিউশনারি গার্ড' (IRGC), যারা সরাসরি শাসনব্যবস্থাকে পাহারা দেয়।
এই সিস্টেম গত ৪০ বছরে আট বছরের যুদ্ধ এবং কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সহ্য করেও টিকে আছে। কারণ তারা রাষ্ট্র আর ধর্মকে এক সুতায় গেঁথে ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সুতো কি এখন ছিঁড়ে যাওয়ার পথে?
৩. বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ: শুধু কি হিজাব?
আজকের আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছিল মাশা আমিনীর মৃত্যু, কিন্তু আসল বারুদ জমে ছিল গত ১৫-২০ বছর ধরে।
শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম: ইরানের বর্তমান প্রজন্ম অত্যন্ত শিক্ষিত এবং আধুনিক। তারা পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চায়।
অর্থনৈতিক ধস: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী। সাধারণ মানুষ যখন দেখে বাজারে রুটির দাম নাগালের বাইরে, তখন তাদের ধৈর্য ভেঙে যায়।
মানসিক দূরত্ব: বিদেশের সাথে শত্রুতা করতে গিয়ে রাষ্ট্র তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে—এমন একটি ধারণা তরুণদের মধ্যে প্রবল হচ্ছে। রাষ্ট্র আর জনগণের ভাষা যখন এক হয় না, তখনই বিপ্লবের মঞ্চ তৈরি হয়।
৪. বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন এবং লেবানন কেন্দ্রিক যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি চলছে, তাতে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোকে টিকিয়ে রাখার চাপ, অন্যদিকে সরাসরি ইসরায়েলি হামলার হুমকি—ইরানকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ভেতর থেকে বিদ্রোহ উসকে দিতে চায়। তবে মনে রাখতে হবে, ইরান কোনো ইরাক বা লিবিয়া নয়। তাদের নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং তাদের একটি বড় জনসমর্থনও আছে যারা এখনো এই ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে।
৫. উপসংহার: ইরান কি ভেঙে পড়বে?
ইরানের পতন কি আসন্ন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরান আর আগের মতো থাকবে না। > "যে দেয়াল বাঁকতে জানে না, সেই দেয়াল এক সময় ভেঙে পড়ে।"
যেকোনো শাসনব্যবস্থা যখন তার তরুণ প্রজন্মের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে, তখন তার আয়ু কমতে শুরু করে। আমেরিকা বা ইসরায়েল হয়তো বাইরে থেকে হাওয়া দিচ্ছে, কিন্তু আগুনের উৎসটা ইরানের ভেতরেই। ইরান যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাদের শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে সংস্কার করতে হবে।
আপনার মতামত কী? এই সভ্যতার লড়াই কি নতুন কোনো ভোরের দিকে নিয়ে যাবে ইরানকে? নাকি আরও এক ভয়াবহ সংঘাতের পথে হাঁটছে দেশটি? কমেন্টে আপনার সুচিন্তিত মতামত জানান।
ভালো লাগলে ব্লগটি শেয়ার করুন এবং নিয়মিত এমন বিশ্লেষণ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন


