ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ৯০ মিনিটের এই জাদুকরী বিনোদন কোটি কোটি মানুষকে একই সুতোয় বাঁধে। কিন্তু আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে, এই ফুটবলই মাঝে মাঝে রূপ নেয় এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কে।
একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন তো—১২ হাজার কিলোমিটার দূরে লাতিন আমেরিকা কিংবা ইউরোপের কোনো মাঠে একটা বল জালে জড়াল। আর তার ঠিক ৩০ সেকেন্ড পর, ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে অন্য একটি দেশের—একটি শান্ত পাড়ার চায়ের দোকানে একজন তরুণের বুকে ছুরি নেমে এলো!
হ্যাঁ, শুনতে অবিশ্বাস্য এবং নির্মম শোনালেও এটাই আমাদের দেশের এক তেতো বাস্তবতা। বড় কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট বা বিশ্বকাপ আসলেই আমাদের দেশে উৎসবের চেয়ে উগ্রতার পরিবেশ বেশি তৈরি হয়। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বা অন্য কোনো দলের জয়-পরাজয় নিয়ে এ পর্যন্ত দেশে নিহত হয়েছেন ডজনেরও বেশি মানুষ, আহত হয়েছেন শত শত।
প্রশ্নটা খুব সোজা এবং সরাসরি—আমরা কি আসলেই খেলা দেখছি? নাকি বিনোদনের নামে নিজেদের বিবেক, বুদ্ধি আর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি?
১. দূর দেশের খেলা, এ দেশের রক্তগঙ্গা
একটা বিষয় কি কখনো খেয়াল করে দেখেছেন? ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ফ্রান্স—এই দেশগুলোর সাধারণ মানুষ বা তাদের তারকা ফুটবলাররা হয়তো বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ কোথায়, সেটাই ঠিকমতো চেনেন না। লিওনেল মেসি কিংবা নেইমার জুনিয়ররা হয়তো জানেনই না যে এশিয়া মহাদেশের একটা বদ্বীপের মানুষ তাদের জন্য একে অপরের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে!
অথচ আমরা কী করছি? আমরা ভিনদেশের ফুটবল দলের জন্য নিজের জীবন দিতে, এমনকি নিজের ভাইয়ের জীবন নিতেও প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছি।
খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু মর্মান্তিক শিরোনাম:
প্রিয় দলের পতাকা চার তলা ছাদের মাথায় টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছিটকে পড়ে মারা গেল ১২ বছরের এক শিশু।
তর্ক করতে গিয়ে আপন দুই ভাইয়ের মধ্যে কাটাকাটি, বন্ধু খুন করছে বন্ধুকে।
প্রিয় দল হেরে গেছে বলে স্ট্রোক করে বা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে কোনো তরুণ।
এটার নাম কি আসলেই খেলাধুলা? এটার নাম কি স্পোর্টসম্যানশিপ? না, এটা কোনো সুস্থ বিনোদন নয়। এটা হচ্ছে একটা চরম সামাজিক ব্যাধি এবং একটা অসুস্থ আবেগের ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ।
২. কেন এই উন্মাদনা? (গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে আমরা কেন এমন উগ্র হয়ে উঠছি? এর পেছনে একটা বড় এবং কষ্টদায়ক সত্য লুকিয়ে আছে।
আমাদের দেশ ফুটবল বা যেকোনো বৈশ্বিক বড় খেলায় বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। আর এই যে একটা শূন্যতাবোধ বা 'আইডেন্টিটি ক্রাইসিস' (Identity Crisis), এটা আমাদের অবচেতন মনকে তাড়া করে বেড়ায়। তখন আমরা কী করি? আমরা অন্য দেশের একটা দল, অন্য দেশের একটা পরিচয়কে ধার করে এনে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিই।
খেয়াল করে দেখবেন, সমর্থকরা কিন্তু সাধারণত বলে না যে "আমি আর্জেন্টিনার খেলা পছন্দ করি" বা "আমি ব্রাজিলের ফ্যান"। তারা বুক ফুলিয়ে বলে—
“আমি আর্জেন্টিনা!”
“আমি ব্রাজিল!”
সমস্যাটা ঠিক এই জায়গাতেই শুরু হয়। যখন ওই দলটা আর শুধু একটা দল থাকে না, ওটা যখন সরাসরি আপনার "আমি" বা আপনার নিজের "অস্তিত্ব" হয়ে যায়, তখন সেই দলের গায়ে সামান্য একটা আঁচড় লাগা মানে আপনার নিজের ইগোতে আঘাত লাগা। দলটা যখন আপনার নিজের পরিচয় হয়ে যায়, তখন খেলা আর স্রেফ ৯০ মিনিটের বিনোদন থাকে না। এটা হয়ে যায় একটা ইগোর যুদ্ধ। এটা হয়ে যায় "আমি বনাম তুমি"র এক আদিম লড়াই। আর এই ইগোর লড়াই যখন মাঠ থেকে বের হয়ে আমাদের মগজে ঢুকে পড়ে, তখনই শুরু হয় সহিংসতা।
৩. সোশ্যাল মিডিয়ার বিষাক্ত জ্বালানি
আমাদের এই উগ্রতার আগুনে দিনরাত পেট্রোল ঢালছে সোশ্যাল মিডিয়া—বিশেষ করে ফেসবুক এবং টিকটক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলিং এখন আর মজার ছলে নেই, এটা এখন নোংরা সাইবার বুলিংয়ে রূপ নিয়েছে। একটা ম্যাচ শেষ হতে না হতেই ফেসবুকে পোস্ট আসে—"ব্রাজিল লুজার" অথবা "আর্জেন্টিনা ফেক, পেনাল্টি দিয়ে জিতেছে"।
ব্যাস! এর পর কমেন্ট সেকশনে শুরু হয় মা-বাবা তুলে গালাগালি, অভিশাপ আর চরম মাত্রার ঘৃণা। এই ভার্চুয়াল কমেন্ট বক্সের আগুনটা যখন বাস্তব জীবনে চায়ের দোকানে বা পাড়ার মোড়ে এসে আছড়ে পড়ে, তখন ইনবক্সের গালিটা রূপান্তরিত হয় হাতের লাঠি বা ছুরিতে। একটা সস্তা ট্রোল, একটা ফেসবুক পোস্ট—আর তার শেষ পরিণতি হচ্ছে একটা তাজা মানুষের লাশ! আমরা কি একবারও ভাবছি, একটা লাইক বা কমেন্টের চেয়ে একটা মানুষের জীবনের মূল্য কত বেশি?
৪. এক নির্মম সত্য ও আমাদের ভণ্ডামি
একটু বুকে হাত দিয়ে নিজের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন তো—আমরা কি আসলেই ফুটবলকে ভালোবাসি? নাকি ফুটবলকে উসিলা বানিয়ে নিজেদের জাহির করতে ভালোবাসি?
আমাদের এই মারামারি বা উগ্রতার পেছনে ফুটবলের প্রতি প্রেম নেই, আছে এক ধরনের সস্তা বীরত্ব দেখানোর মানসিকতা। আমরা প্রমাণ করতে চাই—কে কত বড় ডাই-হার্ড ফ্যান, কার কত বড় পতাকা, কে কত বেশি গালি দিতে পারে, কিংবা কে নিজের দলের প্রতি কত বেশি "লয়াল"।
আমরা এই উগ্রতাকে মনে করি "প্যাশন" বা "পুরুষত্ব"। কিন্তু ফুটবলের আসল প্যাশন দেখতে হলে সুন্দর খেলাকে হাততালি দিন, ৯০ মিনিট গলা ফটিয়ে আপনার প্রিয় দলকে সাপোর্ট করুন, তাদের জার্সি পরুন। কিন্তু খেলা শেষে অন্য দলের সমর্থককে মারধর করা বা নিজের জান বাজি রাখা কোনো প্যাশন না, এটা চরম মূর্খতা আর আদিম বর্বরতা।
৫. একটি রিয়েলিটি চেক: তারা কি আপনার খোঁজ রাখবে?
একবার চোখটা বন্ধ করে সেই পরিবারগুলোর কথা ভাবুন তো, যাদের সন্তান এই খেলা নিয়ে মারামারি করে মারা গেছে।
যে মানুষটা মারা গেল—সে কি আসলেই আর্জেন্টিনার নাগরিক ছিল? লিওনেল মেসি কি তার জানাজায় এসেছিলেন? কিংবা নেইমার কি এসে তার মায়ের চোখের জল মুছে দিয়েছেন? ব্রাজিলের সরকার কি তার পরিবারের আজীবনের দায়িত্ব নিয়েছে?
না, নেয়নি। আর কোনোদিন নেবেও না।
যে মারা গেছে, সে আসলে কোনো আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের কেউ ছিল না। সে ছিল বাংলাদেশের একটা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন। সে ছিল কারো আদরের সন্তান, কারো নির্ভরতার ভাই, কিংবা কোনো অবুঝ শিশুর বাবা। একটা ৯০ মিনিটের সস্তা বিনোদনের জন্য একটা জলজ্যান্ত পরিবার সারাজীবনের জন্য শেষ হয়ে গেল। এই ক্ষতি কি পৃথিবীর কোনো ট্রফি এসে পূরণ করতে পারবে?
৬. আমাদের এখন যা করা উচিত (The Awakening)
আমাদের এখনই থামতে হবে। আমাদের মগজের এই জটটা এখনই খুলতে হবে। খুব সহজ তিনটা জিনিস আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে:
খেলা = স্রেফ বিনোদন: এটা আপনার জীবনের চেয়ে বড় কিছু নয়।
খেলা ≠ আপনার ভবিষ্যৎ: আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল ট্রফি জিতলে আপনার পকেটে এক টাকাও আসবে না, আপনার ক্যারিয়ারও গড়ে উঠবে না।
খেলা ≠ আপনার পরিচয়: আপনার আসল পরিচয় আপনি একজন মানুষ এবং একজন বাংলাদেশী।
আপনি আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করবেন? অবশ্যই করুন, মন উজাড় করে করুন। ব্রাজিলকে ভালোবাসবেন? ভালোবাসুন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দয়া করে—
নিজের জীবনটাকে এই সস্তা উত্তেজনার কাছে বাজি রাখবেন না।
আর একটা বিনোদনের জন্য অন্য কোনো মানুষের জীবন কেড়ে নেবেন না।
উপসংহার
পরের বার যখনই আপনি কোনো ফুটবল ম্যাচ দেখতে বসবেন, যখনই নিজের ভেতরে রাগ বা উত্তেজনা অনুভব করবেন—নিজেকে শক্ত করে জাস্ট একটা প্রশ্ন করবেন: "আমি কি আসলেই খেলাটা উপভোগ করছি... নাকি নিজের ভেতরের জমানো রাগ আর হতাশাটা অন্য মানুষের ওপর উগরে দিচ্ছি?"
যদি উত্তরটা দ্বিতীয়টা হয়, তবে প্লিজ ওখানেই থামুন। কারণ মাঠে একটা গোল মিস হলে ফুটবলের কিচ্ছু যায় আসে না, আপনার প্রিয় দল হেরে গেলেও পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় না... কিন্তু আপনার আবেগের বশে যদি একটা জীবন চলে যায়—তবে সবকিছু চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যায়।
খেলা উপভোগ করুন... কিন্তু সবার আগে মানুষ হয়ে থাকুন।
আপনার কি মনে হয়? আমাদের সমাজে এই ফুটবল উন্মাদনা কমানোর উপায় কী? আপনার মূল্যবান মতামত নিচের কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন। আর পোস্টটি ভালো লাগলে এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন